মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে হরমুজ প্রণালি আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ইরান। ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (IRGC)-এর অনুমতি ছাড়া এখন এই প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’সহ একাধিক জাহাজ।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত কৌশলগত একটি রুট। বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় একটি অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক পদক্ষেপের পর থেকেই প্রণালিটিতে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে তেহরান। শুরুতে কিছু নির্দিষ্ট বন্ধু দেশকে বিশেষ অনুমতির ভিত্তিতে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হলেও সেই তালিকা এখন সীমিত হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, রাশিয়া ও ইরাকসহ কয়েকটি দেশকে শুরুতে অনুমতির আওতায় রাখা হয়েছিল।
তবে কূটনৈতিক সমীকরণে জটিলতা দেখা দেয় তখনই, যখন ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে হত্যার বিষয়ে বাংলাদেশের দেওয়া বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ইরানের পক্ষ থেকে হতাশার কথাও জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্বে অনুমতি পাওয়া একাধিক জাহাজের মধ্যে বর্তমানে ‘বাংলার জয়যাত্রা’সহ কয়েকটি জাহাজকে প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ কি চাইলেই ইরানের পাশে দাঁড়াতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি মূলত দুই স্তম্ভে দাঁড়িয়ে—তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং প্রবাসী আয়। এর মধ্যে পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। ফলে যেকোনো আন্তর্জাতিক অবস্থান, যা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে, তা সরাসরি এই খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ঝুঁকি রাখে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। ২০২৯ সালের পর ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারানোর শঙ্কাও রয়েছে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখন বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় রয়েছে। ইরানের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়া সেই প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সংবেদনশীল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বড় উৎস। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এসব দেশের অনেকেই ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইরানের প্রতি দৃশ্যমান পক্ষপাত মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে, বাংলাদেশ যদি সরাসরি ইরানের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে তা একাধিক স্তরে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। প্রথমত, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে রপ্তানি আয় হ্রাস পেতে পারে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধাক্কা লাগতে পারে। তৃতীয়ত, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে কাতার ও সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীলতা বিবেচনায় সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও একটি বড় বাস্তবতা—বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে বিনিয়োগ প্রবাহ কমে যেতে পারে এবং সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা দেশের ব্যাংকিং ও বাণিজ্য ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের রাজনীতি করতে হচ্ছে। নৈতিক অবস্থান, ভূরাজনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পর্বে দাঁড়িয়ে এমন কোনো অবস্থান গ্রহণ, যা বহুমুখী ঝুঁকি তৈরি করে, তা দেশকে দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে, বিশ্লেষকরাও এমনটাই মনে করছেন।