ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এবং একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনা ঘিরে ওয়াশিংটনে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তির শর্ত ও কাঠামো নিয়ে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ সিনেটরদের মধ্যেই তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শনিবার একাধিক রিপাবলিকান সিনেটর অভিযোগ করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যে কাঠামো গড়ে উঠছে তা মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বড় ধরনেরভাবে বদলে দিতে পারে। তাদের মতে, এর চূড়ান্ত ফলাফল ইসরায়েলের জন্য ‘দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে।
প্রাথমিক খসড়া ও আলোচনার ইঙ্গিত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরের দিকে অগ্রগতি হচ্ছে, যার লক্ষ্য যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী আলোচনার জন্য একটি পথ তৈরি করা।
তবে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্পষ্ট অগ্রগতির অনুপস্থিতি সমালোচনাকে আরও তীব্র করেছে।
এর আগে ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না এবং তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত পরিত্যাগ করতে হবে। কিন্তু নতুন আলোচনায় এসব শর্ত স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় প্রশাসনের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, চলমান আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যু অন্তর্ভুক্ত নয়।
আরও পড়ুন : পঞ্চগড়ে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ভিজিএফ’র চাল ও গৃহ মঞ্জুরী বিতরণ করলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
দক্ষিণ ক্যারোলাইনার প্রভাবশালী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, এমন কোনো চুক্তি, যা ইরানকে আঞ্চলিকভাবে শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসে, তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করবে।
তিনি বলেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব বজায় রাখে এবং উপসাগরীয় তেল অবকাঠামোতে হামলার সক্ষমতা ধরে রাখে, তাহলে দেশটি কার্যত একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হবে।
গ্রাহাম আরও বলেন, এটি আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনবে এবং ভবিষ্যতে ‘ইসরায়েলের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে।
তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রিপাবলিকান সিনেটরদের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টেও শেয়ার করা হয়েছে।
সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান টম কটন এবং সেনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকারও পৃথক বিবৃতিতে চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
উইকার সতর্ক করে বলেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে কোনো চুক্তি করা ‘বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত’ হবে।
তিনি আরও দাবি করেন, সামরিক অভিযানে যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তা এমন চুক্তির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে টেড ক্রুজ বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তার মতে, ইরান যদি অর্থনৈতিক সুবিধা পায়, পারমাণবিক সক্ষমতা বজায় রাখে এবং হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য বড় কৌশলগত ভুল হবে।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওও আলোচ্য চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এটি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং বরং ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির পুনরাবৃত্তির মতো শোনাচ্ছে।
তার মতে, ইরানকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী।
চুক্তি নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগও সামনে এসেছে। সম্প্রতি সিনেটে একটি প্রস্তাব ৫০-৪৭ ভোটে অগ্রসর হয়, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়।
তবে রিপাবলিকান নেতৃত্বের কারণে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে অনুরূপ ভোট স্থগিত হওয়ায় রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, রিপাবলিকান নেতৃত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে ভোট বিলম্বিত করেছে, কারণ প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
সব মিলিয়ে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন নিজ দলের ভেতর থেকেই তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। একদিকে কিছু সিনেটর আরও কঠোর সামরিক অবস্থান চাইছেন, অন্যদিকে কেউ কেউ এই সম্ভাব্য চুক্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভক্ত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।