কবি, সৈনিক, গীতিকার, সম্পাদক, সুরকার, চলচ্চিত্রকর্মী ও সাম্যের কণ্ঠস্বর হিসেবে এক বিস্ময়কর জীবনযাত্রা।
বাংলা সাহিত্য ও উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যার জীবন ও কর্মকে কোনো একক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ নন; তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সাংবাদিক, সম্পাদক, সৈনিক, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং সামাজিক বৈষম্য ও ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। তাঁর সৃষ্টিকর্ম যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি তাঁর জীবনও ছিল সংগ্রাম, সৃজনশীলতা, প্রেম, বিদ্রোহ ও গভীর ট্র্যাজেডিতে পরিপূর্ণ।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। অল্প বয়সেই পিতাকে হারানোর পর সংসারের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় নজরুলকে। জীবিকার প্রয়োজনে কখনো মক্তবে শিক্ষকতা, কখনো মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব, কখনো মাজারে খাদেমের কাজ, আবার কখনো রুটির দোকানে শ্রমিক হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। শৈশবের এই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কারণেই তাঁর ডাকনাম হয়ে ওঠে ‘দুখু মিয়া’।
কৈশোরে তিনি স্থানীয় লেটো দলে যোগ দেন। এই লেটো দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্য ও সংগীতজীবনের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি পালাগান লিখতেন, অভিনয় করতেন এবং দলের জন্য গান রচনা করতেন। এখান থেকেই তাঁর নাট্যবোধ, সুরসৃষ্টি ও কাব্যিক প্রকাশভঙ্গির বিকাশ ঘটে। অল্প বয়সেই বাংলা, আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তাঁর লেখনীকে দেয় স্বতন্ত্র মাত্রা। বিশেষ করে ফারসি শব্দ ও ইসলামী ঐতিহ্যের প্রভাব তাঁর কবিতা ও গানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে নজরুল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। তিনি সেখানে হাবিলদার পদে দায়িত্ব পালন করেন। করাচির সেনানিবাসে অবস্থানকালে তিনি গভীরভাবে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন এবং ফারসি কবি হাফিজ, রুমি ও ওমর খৈয়ামের সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে নতুন শক্তি দেয়। যুদ্ধ, বিদ্রোহ, শক্তি ও মুক্তির বিষয়গুলো তাঁর কবিতা ও গানে তীব্রভাবে উঠে আসে।
সেনাজীবন শেষে কলকাতায় ফিরে নজরুল সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯২১ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যায়। কবিতাটি প্রকাশের পর পুরো সাহিত্যাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এতে তিনি সাম্য, মানবমুক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তা সে সময়ের তরুণ সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
> “আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!”
নজরুলের সাহিত্যচর্চা কেবল নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁর লেখনী ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদের হাতিয়ার। তিনি ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’, ‘নবযুগ’সহ বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে। পরবর্তীতে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে থেকেও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন এবং রাজবন্দীদের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদে দীর্ঘ অনশন পালন করেন। তাঁর অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও।
আরও পড়ুন : অযত্ন-অবহেলায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ‘বিলদহর ব্রিজ’
রাজনৈতিকভাবে নজরুল সাম্যবাদী ও মানবতাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। শ্রমিক, কৃষক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকারের পক্ষে তিনি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কবিতা কিংবা ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় সেই দৃষ্টিভঙ্গির শক্তিশালী প্রকাশ দেখা যায়। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্থায়ী রাজনীতিক ছিলেন না; বরং তাঁর মূল অবস্থান ছিল শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
সংগীতের জগতেও নজরুল ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। গবেষকদের মতে, তিনি প্রায় চার হাজারেরও বেশি গান রচনা করেন এবং অধিকাংশ গানে নিজেই সুরারোপ করেন। তাঁর রচিত গানগুলো আজ ‘নজরুলসংগীত’ নামে পরিচিত। প্রেম, প্রকৃতি, দেশাত্মবোধ, গণজাগরণ, ইসলামী সংগীত, গজল, শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও ভক্তিগীতি—প্রায় সব ধারাতেই তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একইসঙ্গে ইসলামী সংগীত ও হিন্দু ধর্মীয় সংগীত রচনার মাধ্যমে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বিরল উদাহরণ স্থাপন করেন।
নজরুল আধুনিক বাংলা সংগীতে রাগভিত্তিক গানের প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বহু নতুন সুর ও ধারা বাংলা গানে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর গান গ্রামোফোন কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সে সময়ের খ্যাতিমান শিল্পীরা তাঁর গান পরিবেশন করেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গেও নজরুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৯৩০-এর দশকে কলকাতার চলচ্চিত্রজগতে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। তিনি চলচ্চিত্রে গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন এবং সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৩৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয়ও করেন। এছাড়া চলচ্চিত্রের জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও কাব্যধর্মী গান রচনায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও নজরুল ছিলেন সামাজিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। ১৯২৪ সালে হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া প্রমিলা দেবীকে বিয়ে করে তিনি ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান নেন। তাঁর এই আন্তঃধর্মীয় বিবাহ সে সময়ের সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ব্যক্তিজীবনে যেমন, সাহিত্যেও তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সাম্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।
তবে জীবনের শেষভাগ ছিল অত্যন্ত বেদনাময়। একের পর এক পারিবারিক বিপর্যয় তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত করে। তাঁর প্রিয় সন্তান বুলবুলের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে ভেঙে দেয়। পরে স্ত্রী প্রমিলা দেবীও পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। এর মধ্যেই ১৯৪২ সালে নজরুল হঠাৎ বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘদিন তাঁর অসুস্থতার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা ধারণা দেন, তিনি ‘পিকস ডিজিজ’ নামক বিরল নিউরোলজিক্যাল রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এর ফলে জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে প্রায় নির্বাক অবস্থায় কাটাতে হয়।
যে মানুষ একসময় বিদ্রোহ, প্রেম ও সাম্যের গান শুনিয়ে পুরো বাংলা সাহিত্যকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, জীবনের শেষ ৩৪ বছর তাঁকে কাটাতে হয়েছে নীরবতার গভীর অন্ধকারে।
> “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই,
যেন গোরের থেকে মোয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।”
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে নজরুলকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করে এবং জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৬ সালে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। একই বছরের ২৯ আগস্ট তিনি ঢাকায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
কাজী নজরুল ইসলামের জীবন মূলত এক নিরন্তর সংগ্রাম, অসাধারণ সৃজনশীলতা এবং মানবমুক্তির পক্ষে অবিচল অবস্থানের ইতিহাস। দরিদ্র ‘দুখু মিয়া’ থেকে সৈনিক, সম্পাদক, সুরকার, চলচ্চিত্রকর্মী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রা আজও বাঙালির আত্মপরিচয়, সাহস ও মুক্তচিন্তার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।