সামরিক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ভ্যাটিকানের প্রধান ধর্মগুরু পোপ লিও চতুর্দশ। তিনি এ ধরনের ব্যবহারের প্রবণতাকে ‘ধ্বংসাত্মক চক্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
শিগগিরই ভ্যাটিকানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একটি নতুন নীতিগত ইশতেহার ‘ম্যাগনিফিকা হিউম্যানিটাস’ (মহিমান্বিত মানবতা) প্রকাশ করা হবে। চার্চের ইতিহাসে প্রথম মার্কিন পোপ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হতে যাচ্ছে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক উদ্যোগ। তার আগেই তিনি এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
সামরিক এআই ঘিরে বৈশ্বিক বিতর্কের মধ্যেই মন্তব্য
সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে এআই ব্যবহারের নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’ মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের মডেল ‘ক্লড’-কে স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্র কিংবা গণ নজরদারির কাজে ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ সামরিক কার্যক্রমে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে অ্যানথ্রোপিক নীতিগতভাবে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মানুষের সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো এআই যেন হত্যা বা ব্যাপক নজরদারির মতো কাজে ব্যবহৃত না হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই পোপ লিও স্পষ্ট করে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মানব নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এআই ব্যবহারের প্রবণতা মানবসভ্যতার জন্য গভীর ঝুঁকি তৈরি করছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সতর্কতা
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক বাজার প্রায় ৪.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি। তবে এই বিপুল প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
ভ্যাটিকানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্থনৈতিক লাভ সীমিত কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতেই কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বৈশ্বিক বৈষম্যকে আরও গভীর করতে পারে। এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও। তিনি বলেন, শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবতার স্বার্থে এআই নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।
অ্যালগরিদম ও মানব চিন্তার ঝুঁকি
পোপ লিও চতুর্দশ আরও সতর্ক করে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম মানুষের বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতাকে বিকৃত করতে পারে। তিনি ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, মানুষকে অবশ্যই জানতে হবে কীভাবে অ্যালগরিদম তাদের চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
আরও পড়ুন : ১২৭তম নজরুল জন্মজয়ন্তী ও তারুণ্যের ভাবনা
এর আগে জানুয়ারিতে তিনি চ্যাটবট অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আর এপ্রিলে তিনি মন্তব্য করেন, এআই প্রযুক্তি ‘মেরুকরণ, সংঘাত, ভয় ও সহিংসতা’ বাড়িয়ে দিতে পারে। চার্চের দীর্ঘদিনের গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি হতে যাওয়া ‘ম্যাগনিফিসেন্ট হিউম্যানিটি’ প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পূর্বসূরিদের উদ্বেগের ধারাবাহিকতা
পোপ লিওর পূর্বসূরি পোপ ফ্রান্সিসও এআই প্রযুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ জোরদারের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, এআই বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন ‘ম্যাগনিফিকা হিউম্যানিটাস’ ইশতেহারটি ২০১৫ সালে পোপ ফ্রান্সিসের জলবায়ু বিষয়ক ঐতিহাসিক দলিল ‘লাওদাতো সি’-এর মতোই বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: দ্য স্ট্রেইট টাইমস, ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর