আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘ অস্থিরতার পর প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে ইরান। তবে এবার এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম ও ট্রানজিট ফি আরোপের সম্ভাবনার কথাও সামনে এসেছে।
রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারবিধি নির্ধারণে ইরান এবং ওমান যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের জন্য প্রদত্ত বিভিন্ন সেবার বিনিময়ে ট্রানজিট ফিসহ অন্যান্য চার্জ নির্ধারণ করা হতে পারে।
রুশ সংবাদমাধ্যম ইজভেস্তিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জালালি বলেন, “হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে ইরান ও ওমান একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবে।”
বিশ্বের সামুদ্রিক পথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজের গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র হওয়ার পর এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যায়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলাচল ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়।
এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে টোল বা ট্রানজিট ফি আরোপের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং উপসাগরীয় কয়েকটি রাষ্ট্র এ ধরনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে বলে জানা গেছে। একই সময়ে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলা ও আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে ইরানের বার্তাসংস্থা তাসনিমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাজেম জালালি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চলমান যোগাযোগ নিয়েও মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আলোচনায় ইউরোপের কোনো ভূমিকা নেই।”
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, সেখানে ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি অংশীদার নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ওমানের রাষ্ট্রদূত তালাল বিন সুলাইমান আল-রাহবি ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করেছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের ধারণাকে ওমান সমর্থন করে না। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমান নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ওমানের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ইরানের সঙ্গে তারা এমন একটি ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও বিদ্যমান সামুদ্রিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সঙ্গে পরামর্শ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালির যৌথ তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে ওমান। পাশাপাশি আঞ্চলিক বিভিন্ন সংকটে দেশটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও পরিচিত।
সম্প্রতি ওমান ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে। একই সঙ্গে বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের হামলার ঘটনাতেও উদ্বেগ প্রকাশ করে তার নিন্দা জানিয়েছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার উদ্যোগ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে টোল আরোপ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা না হলে নতুন কূটনৈতিক জটিলতাও তৈরি হতে পারে।