ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান অন্তর্দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। একাধিক দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে মতবিরোধ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনীহা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে নাগরিক সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রকৌশল সেবা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা সেবায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে করপোরেশনের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, দায়িত্ব বণ্টন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ চলছে। এসব বিরোধের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি বিভাগের সিদ্ধান্ত অন্য বিভাগ বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি করছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত সেবাও সময়মতো পৌঁছানো যাচ্ছে না।
করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বিলম্ব দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ফাইল একাধিক টেবিল ঘুরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ আটকে থাকছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধের কারণে অনেক বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগে চলমান সমন্বয়হীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন সড়ক সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ, ফুটপাত উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অফিসার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম কিবরিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাময়িক বরখাস্তের আদেশে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্র থেকে তার বিরুদ্ধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সকল ধরণের টেন্ডার কাজ নিয়ন্ত্রণ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন মার্কেটের দোকান বরাদ্দ ও পরিচালনায় নানা অনিয়মসহ দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুস্পষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে এ বিভাগের একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। উক্ত তদন্তকার্য সুস্পষ্টভাবে পরিচালনা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সদর দপ্তরে সংযুক্ত করে সাময়িক বরখাস্ত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। যেখানে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ উল্লেখ করা হয়নি। বা অভিযোগকারীও উল্লেখ করা হয়নি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে এখন আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে। ফ্যাসিষ্ট আমলে যারা দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন তারা সব জোট হয়েছে। ফ্যাসিষ্ট বিরোধী যেসব কর্মকর্তা কর্মচারীরা ছিলেন তারা এখন অনেকটাই কোনঠাসা। এই অবস্থায় সংস্থার অফিসার্স এসোসিয়েশনের সভাপতিকে তাড়াতে পারলে তাদের পোয়াবারো।
প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়াকে সাময়িক বরখাস্তের চিঠি পাওয়ার পর ডিএসসিসি নগরভবনে কর্মকর্তাদের মাঝে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন নগরভবনের কর্মকর্তাদের অন্তর্দ্বদ্বের জের থেকে কিছু সুবিধাবাদী কর্মকর্তা তাকে বরখাস্ত করিয়েছেন।
বেশকয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, গত আওয়ামী লীগ আমলে প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া ২৬ মামলার শিকার হয়েছেন। গ্রেফতার হয়ে জেল খেটেছেন। দীর্ঘদিন পালিয়ে বেরিয়েছেন। ৬ বছর ছিলেন চাকুরীচ্যুত। তার বাবা-ভাইসহ আত্মীয়স্বজন অনেকের নামেই একাধিক মামলা হয়েছে। যিনি আওয়ামী বিরোধী প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সামনের সারিতে ছিলেন। জুলাই বিপ্লবে যিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন সেই ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট কোন কারণ ছাড়াই সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
তারা আরো বলছেন, আধিপত্য বিস্তারের জন্য ফ্যাসিষ্ট আমলের কিছু কর্মকর্তা মিলে উপর মহলের কান ভারি করে গোলাম কিবরিয়াকে তাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গোলাম কিবরিয়া ২০১৮ সালের ২৯ এপ্রিল গ্রেফতার হয়ে তিনি ৪ মাস ৬ দিন জেল খাটেন। ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে তার বিরুদ্ধে শ্যামপুর থানায় ২টি, ওয়ারী থানায় ২টি, যাত্রাবাড়ি থানায় ২টি, পল্টন থানায় ৮টি, শাহবাগ থানায় ৪ টি এবং রমনা থানায় ৮ টি মামলা দায়ের হয়। তার সেজ ভাইয়ের বিরুদ্ধে ছিলো ২৯ মামলা, বাবার বিরুদ্ধে ছিলো ২টি মামলা। এই মামলায় তার বাবা-ভাইয়েরাও মাসের পর মাস জেল খেটেছেন।
একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপির রাজনীতি করায় গত ১৬ বছর ধরে অবহেলিত ছিলেন গোলাম কিবরিয়া। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সাঈদ খোকন মেয়র থাকাকালীন ২০১৪ সাল থেকে টানা ৬ বছর চাকরি ছিল না। শেখ ফজলে নূর তাপস থাকাকালীন ৪ বার বদলী হতে হয়েছে। জুনিয়ররা পদোন্নতি পেলেও সিনিয়রিটি থাকার পরও বারবার পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন গোলাম কিবরিয়া। শুধু তাই নয়-বিগত আওয়ামী সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে ছিল ৪৭টি রাজনৈতিক মামলা, এখনও ১৮টি মামলা রয়েছে। যার জন্য এখনো তাকে প্রতিনিয়ত আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরতে হয়। ২০১৭ সালে রাজনৈতিক মামলায় ১৪৬ দিন কারাবরণ করেছেন তিনি। ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বর্তমানে গোলাম কিবরিয়া চলতি দায়িত্ব পালন করছেন অথচ নিয়ম অনুযায়ী তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে তার। এদিকে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার বিরুদ্ধে নানাভাবে উঠেপড়ে লেগেছে। বদলী ও প্রমোশন করে থাকে কর্তৃপক্ষ, অথচ এর দায়ভার গোলাম কিবরিয়ার উপর চাপিয়ে একটি মহল সুবিধা নিতে চাচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে গোলাম কিবরিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যেহেতু অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে এই মুহূর্তে কিছু বলবো না। #