বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জন্য এক নতুন আশার আলো দেখালেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। প্রাণঘাতী এইডস (AIDS) রোগের জন্য দায়ী এইচআইভি (HIV) ভাইরাসকে পরীক্ষাগারে বা ল্যাবরেটরিতে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছেন একদল গবেষক। নোবেলজয়ী জীন-সম্পাদনা প্রযুক্তি ‘ক্রিসপার’ (CRISPR/Cas9) ব্যবহার করে এই অভাবনীয় সাফল্য পাওয়া গেছে।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের (Amsterdam UMC) একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন, যার অন্যতম প্রধান গবেষক ড. এলিনা হেরেরা (Dr. Elena Herrera Carrillo)। ইউরোপীয় কংগ্রেস অব ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (ECCMID)-এর এক সম্মেলনে এই গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
যেভাবে কাজ করে এই ‘জিনের কাঁচি’ – সাধারণত এইচআইভি ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নিজস্ব ডিএনএ উপাদানকে মানবদেহের ডিএনএ-র সাথে একীভূত করে ফেলে। ফলে প্রচলিত ওষুধ দিয়ে একে শরীর থেকে পুরোপুরি বের করা অসম্ভব ছিল। বিজ্ঞানীরা এই জট খুলতে ব্যবহার করেছেন ২০২০ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী প্রযুক্তি CRISPR/Cas9, যাকে সহজ ভাষায় বলা হয় ‘আণবিক কাঁচি’ (Molecular Scissors)।
গবেষণাগারে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা আক্রান্ত কোষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এইচআইভি ভাইরাসের নির্দিষ্ট ডিএনএ অংশটি খুঁজে বের করেন এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তা কেটে আলাদা বা ধ্বংস করে দেন। এর ফলে আক্রান্ত টি-সেল বা নিরাপত্তা কোষগুলো ভাইরাস থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়।
আরও পড়ুন : দেবীগঞ্জে কোরবানির জন্য প্রস্তুত ২৩ হাজার পশু
বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও বর্তমান বাস্তবতা – গবেষকদের পক্ষ থেকে ড. এলিনা হেরেরা জানান, এই আবিষ্কারটি এইচআইভি নিরাময়ের গবেষণায় একটি “যুগান্তকারী প্রাথমিক ধাপ” (Proof of Concept)। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, এই সাফল্য এখনই সাধারণ রোগীদের জন্য চূড়ান্ত চিকিৎসা নয়।
মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ল্যাবরেটরির টেস্টটিউবে সফল হওয়া এবং একটি জীবিত মানুষের জটিল শরীরে এই প্রযুক্তি সফলভাবে প্রয়োগ করার মধ্যে বিশাল তফাত রয়েছে। মানুষের পুরো শরীরে ছড়িয়ে থাকা ভাইরাসের ‘লুকানো আধার’ (Viral Reservoirs) সনাক্ত করে সেখানে নিরাপদে এই ক্রিসপার প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য:”ল্যাবের এই ফলাফল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক এবং এটি প্রমাণ করে যে প্রযুক্তির সাহায্যে এইচআইভি ভাইরাসকে ডিএনএ থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব। তবে এটি সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় ঔষধ বা থেরাপি হিসেবে বাজারে আসতে আরও বেশ কয়েক বছর নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হবে।”
বিশ্বব্যাপী স্বস্তির হাওয়া – বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে এখনও প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষ এইচআইভি ভাইরাসের সাথে বসবাস করছেন। ২০২২ সালেও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং নতুন করে সংক্রমিত হয়েছেন আরও ১৩ লাখ।
দীর্ঘদিন ধরে এই রোগের কোনো স্থায়ী নিরাময় না থাকায় এইডস আক্রান্তদের আজীবন অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির (ART) ওপর নির্ভর করতে হতো। ল্যাবরেটরিতে ক্রিসপারের এই সফলতার খবর বিশ্বজুড়ে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং চিকিৎসকদের মাঝে দীর্ঘদিনের চিকিৎসা না থাকার গ্লানি মুছে এক পশলা স্বস্তির হাওয়া এনে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনে তৈরি হবে এইচআইভি-র প্রথম চূড়ান্ত নিরাময় ব্যবস্থা।