২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় যখন বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা সংকট ও আতঙ্ক চরমে, তখন নতুন ওষুধ ও ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে ব্যস্ত ছিল আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো। এই সময়েই বাংলাদেশের একটি ওষুধ কোম্পানি—ট্রান্সকম গ্রুপের মালিকানাধীন এসকেএফ—নিয়ে বাজারে ওঠে বিতর্কিত কিছু অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, মহামারির সময়ে মানুষের অসহায় পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে এসকেএফ “করোনা চিকিৎসার মুখে খাওয়ার ওষুধ” হিসেবে একটি ওষুধ বাজারজাত করে বিপুল অর্থ আয় করে।
২০২১ সালের ১০ নভেম্বর এসকেএফ ঘোষণা দেয় যে তারা করোনা চিকিৎসায় বিশ্বে প্রথম অনুমোদিত ওষুধ ‘মলনুপিরাভির’ বাংলাদেশের বাজারে এনেছে। ওইদিন রাজধানীর বনানীতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ওষুধটির বাজারজাতকরণের ঘোষণা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সব অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে ওষুধটি বাজারে আনা হয়েছে।
আরও পড়ুন :সভা-সমাবেশে প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নেই
কোম্পানির দাবি ছিল—
“সব আনুষ্ঠানিকতা ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষে তাঁরা ওষুধটি বাজারে এনেছেন। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দেড় বছরের বেশি বিশ্বে ৫০ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় এতদিন অনুমোদিত কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ ছিল না। ৪ নভেম্বর এর চিকিৎসায় মলনুপিরাভিরের অনুমোদন দেয় যুক্তরাজ্য। করোনা সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একজন প্রাপ্তবয়স্ককে সকালে চারটি ও রাতে চারটি ক্যাপসুল সেবন করতে হবে। এভাবে পাঁচ দিনে ৪০টি ক্যাপসুল সেবন করতে হবে। প্রতি ক্যাপসুলের দাম ধরা হয়েছিল ৫০ টাকা।”
তবে আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নাল ও বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মলনুপিরাভির মূলত করোনার নির্দিষ্ট ওষুধ নয়; এটি জ্বর বা ফ্লু-জাতীয় উপসর্গে ব্যবহৃত একটি মুখে খাওয়ার ক্যাপসুল।
ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নালের তথ্য অনুযায়ী এটি ফ্লুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, আর যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএও এটিকে জ্বর ও ফ্লু উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে—করোনার নির্দিষ্ট ওষুধ হিসেবে নয়।
কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রচারিত বক্তব্যে বলা হয়—
“Eskayef is very happy to share the launching news of UK MHRA Approved Oral Anti-Covid drug Molnupiravir with brand name MONUVIR 200 Capsule, which is world’s 1st generic Molnupiravir from UK MHRA Approved Plant.”
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এ ওষুধকে করোনা চিকিৎসার নির্দিষ্ট ওষুধ হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর কোম্পানিটি ওষুধটি বাজার থেকে সরিয়ে নেয় বলে জানা যায়।
অন্যদিকে, ঔষধ প্রশাসন আইন অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও এ ঘটনায় কোনো বড় ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসকেএফের কিছু অন্যান্য ওষুধ নিয়েও বাজারে ভিন্ন ব্র্যান্ডে একই উপাদান ব্যবহার, মূল্য নির্ধারণ ও বাজার সিন্ডিকেটের অভিযোগ রয়েছে। যেমন Esoral MUPS এবং Losectil—দুটি ভিন্ন নামে একই কার্যকারিতার ওষুধ বাজারে বিক্রির বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
এছাড়া Ostocal GX ও Xinc B নামের কিছু ওষুধের কার্যকারিতা ও মান নিয়েও ফার্মাসিস্টদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য দিতে রাজি হননি।