শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
Manarat Invitational- Chapter One এ বিজয়ী জবি ডিবেটিং সোসাইটির টিম ‘একাত্তরের গণহত্যা’ জবি মনোবিজ্ঞান অ্যালামনাইয়ের নতুন কমিটি ঘোষণা, নেতৃত্বে আরিফুল-শাকিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ–২০২৬ ভৈরবে সাবেক কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা সৈকতকে কুপিয়ে হত্যা জুলাই সনদের পথ ধরেই হাঁটবে সরকার: আইনমন্ত্রী তিন বন্ধুর হাত ধরে মফস্বলে স্বপ্নের দিগন্তে ‘অ্যাবসাইন ফ্যাশন’ সিংড়ার সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ বানরীপাড়ায় ইয়াবা ও গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারি আটক নীলফামারীতে এনডিইএ’র আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা ২১ শে আগস্ট উপলক্ষে জবিতে ব্যানার দিয়ে উপস্থিতি জানান দিল ছাত্রলীগ

দিল্লিতে ভয়াবহ শিশু পাচার চক্র: ছেলে শিশু ৮ লাখ, মেয়েশিশুর মূল্য তার অর্ধেক

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬
  • ২৫ মোট ভিউ

রাজস্থানে জন্ম নেয়া একটি নবজাতক মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পাচার হয়ে পৌঁছে গেল দিল্লিতে। সেখান থেকে আবার কয়েক লাখ রুপির বিনিময়ে তাকে বিক্রি করে দেয়া হলো হরিয়ানার এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে। একটি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে তার পরিবারের দারিদ্র্য আর অপরাধচক্রের লোভের কারণে।

 

এমনই এক ভয়াবহ শিশু পাচারচক্রের সন্ধান পেয়েছে দিল্লি পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটি দরিদ্র পরিবারের মাত্র চার থেকে পাঁচ দিন বয়সী নবজাতকদের সংগ্রহ করে রাজধানীতে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে লাখ লাখ রুপির বিনিময়ে বিক্রি করত। এই ভয়ঙ্কর চক্রের মূল চরিত্র ছিল মানবপাচারকারী, সন্তানহীন দম্পতি এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক।

তদন্তে জানা গেছে, মেয়েশিশু বিক্রি হতো তিন থেকে চার লাখ রুপিতে। অন্যদিকে ছেলেশিশুর দাম ছিল ছয় থেকে আট লাখ রুপি।

মধ্য দিল্লির পাহাড়গঞ্জ এলাকার এক বাসিন্দা পুলিশকে জানান, তিনি নিয়মিত এক নারীকে এলাকায় দেখতে পান, যিনি প্রতিবারই ভিন্ন ভিন্ন নবজাতক নিয়ে আসতেন। এই তথ্যই তদন্তের সূচনা করে। পুলিশ এলাকার নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে এবং গোপন তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। কয়েক দিনের অনুসন্ধানের পর তারা ওই নারীকে শনাক্ত করে। তদন্তে স্পষ্ট হয়, জ্যোতি ওরফে কমলেশ নামের ওই নারী শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িত।

ছদ্মবেশী ক্রেতার অভিযান

পুলিশ এরপর একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এক নারী পুলিশ সদস্যকে শিশুক্রেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে কমলেশের সঙ্গে যোগাযোগ করানো হয়। উভয়ের মধ্যে বৈঠক হয় এবং একটি শিশু কেনাবেচার বিষয়ে সমঝোতা হয়। অগ্রিম হিসেবে ২০ হাজার রুপি দেয়ার কথাও ঠিক হয়। গত ৫ জুন কমলেশ একটি নবজাতক নিয়ে ওই নারী পুলিশের কাছে আসেন। শিশুটিকে হস্তান্তরের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য পুলিশকে বিস্মিত করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, এটি শুধু দিল্লিকেন্দ্রিক নয়; বরং একাধিক রাজ্যে বিস্তৃত একটি সংগঠিত পাচারচক্র। রাজস্থান ও গুজরাটের দরিদ্র পরিবারগুলো থেকে নবজাতক শিশু সংগ্রহ বা চুরি করে মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানার নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বিক্রি করা হতো।

একের পর এক গ্রেপ্তার

কমলেশকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে পুলিশ তার দুই সহযোগী শালু ও ললিতকে শনাক্ত করে। পরে প্রতিভা ও বিপিন নামের আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা নবজাতক সংগ্রহ এবং বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করার কাজে জড়িত ছিল। প্রতিভা ও বিপিনকে গ্রেপ্তার করা হয় যখন তারা শিশু সরবরাহকারী এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিল। তাদের কাছ থেকে প্রায় তিন লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়।

দুই সপ্তাহের ধারাবাহিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ এক মাসের কম বয়সী পাঁচটি নবজাতককে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এরপর তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়—শিশুগুলো কোথা থেকে এসেছে? কারা তাদের সংগ্রহ করত? রাজধানীতে কোথায় রাখা হতো?এবং কার কাছে বিক্রি করা হয়েছে?

পাচারের কেন্দ্র ছিল একটি হাসপাতাল

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ পশ্চিম দিল্লির রোহিণীর বেগমপুর এলাকায় অবস্থিত একটি বহুমুখী হাসপাতালের সন্ধান পায়। তদন্তে দেখা যায়, হাসপাতালটি পুরো পাচারচক্রের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছিল এবং এর মালিক চিকিৎসক বিবেকী ছিলেন পুরো চক্রের প্রধান সমন্বয়কারী। মধ্য জেলার উপ-পুলিশ কমিশনার রোহিত রাজবীর সিং জানান, শিশুদের ক্রেতার কাছে হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত ওই হাসপাতালেই রাখা হতো।

তিনি বলেন, এই পুরো চক্রের মূল ব্যক্তি চিকিৎসক বিবেকী। শিশুদের জন্মসংক্রান্ত নথি জাল করতে তিনি সহায়তা করতেন। জন্মসনদ, প্রসবসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং বিল—সবই তার হাসপাতাল থেকে জাল করা হতো, যাতে মনে হয় শিশুগুলোর জন্ম সেখানেই হয়েছে।

পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, একটি মেয়েশিশু প্রায় এক লাখ রুপিতে সংগ্রহ করা হতো এবং পরে তিন থেকে চার লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো। অন্যদিকে ছেলে শিশু প্রায় দুই লাখ রুপিতে সংগ্রহ করে ছয় থেকে আট লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো। তদন্তকারীদের মতে, শিশু বিক্রির বেশিরভাগ চুক্তিই হাসপাতালটিতে সম্পন্ন হতো। চিকিৎসক বিবেকী ক্রেতা দম্পতি এবং পাচারকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গুজরাটের সাবরকাঁঠা এলাকা থেকে সাবাভাই ঘামার ওরফে কালিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। মূলত উদয়পুরের বাসিন্দা এই ব্যক্তি রাজস্থানের পালি এবং গুজরাটের সাবরকাঁঠা এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছ থেকে শিশু কিনে এনে দিল্লির ওই হাসপাতালের মাধ্যমে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বিক্রি করতেন বলে অভিযোগ।

পুলিশ এখন উদ্ধার হওয়া শিশুদের জৈবিক বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। তারা স্বেচ্ছায় সন্তান বিক্রি করেছিলেন, জোরপূর্বক বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছিল, নাকি শিশুদের চুরি করা হয়েছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, যদি কোনো পরিবার স্বেচ্ছায় সন্তান বিক্রি করে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হবে।

তদন্তে উঠে এসেছে, গত এক বছরে ঘামার ও তার সহযোগীরা অন্তত ৩০টি নবজাতক পাচার করেছে। এসব শিশু মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানার বিভিন্ন নিঃসন্তান দম্পতির কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। পুলিশ ইতোমধ্যে হরিয়ানার পানিপথ থেকে সানি অরোরা ও রিতু অরোরা নামে এক দম্পতিকে এবং মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকে আরেক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে শিশু কেনার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তদন্তে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথাও উঠে এসেছে। উপপুলিশ কমিশনার রোহিত রাজবীর সিং জানান, এক দম্পতি একটি ছেলে শিশু কিনতে চেয়েছিলেন। সে সময় পাচারচক্রের কাছে একটি মেয়েশিশুও ছিল, যাকে দ্রুত বিক্রি করতে তারা আগ্রহী ছিল। তাই তারা একটি ছেলে ও একটি মেয়েশিশুকে যমজ সন্তান হিসেবে পরিচয় দিয়ে ওই দম্পতির কাছে ৯ লাখ রুপিতে বিক্রি করে। পরে তদন্তে জানা যায়, দুটি শিশু ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে আনা হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক ছিল না।

উদ্ধার হওয়া শিশুদের বর্তমান অবস্থা

উদ্ধার হওয়া পাঁচ নবজাতককে শিশু কল্যাণ কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে তারা কমিটির আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। শিশু কল্যাণ কমিটি সুরক্ষা ও পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে এমন শিশুদের দেখভালের একমাত্র আইনগত কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার হওয়া শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের বিশেষায়িত দত্তক সংস্থা, শিশু নিবাস অথবা আইনগতভাবে দত্তকযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় এই সংস্থা।

সূত্র: এনডিটিভি

শেয়ার করুন

One thought on "দিল্লিতে ভয়াবহ শিশু পাচার চক্র: ছেলে শিশু ৮ লাখ, মেয়েশিশুর মূল্য তার অর্ধেক"

Comments are closed.

আরো সংবাদ ...
কপিরাইটঃ ২০২৬ দৈনিক সংবাদ শিরোনাম এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Developed by Infix Digital