জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বাংলা বিভাগের বিতর্কিত অধ্যাপক ও জুলাই হত্যা মামলার আসামি ড. মিল্টন বিশ্বাসকে পুনরায় ক্লাস রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করে পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে । প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুরুতে বিষয়টি অস্বীকার করা হলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভাগীয় ‘একাডেমিক কমিটি’র সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই তাকে পুনরায় একাডেমিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার তোড়জোড় চলছে। এই ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বুধবার (৬ মে) বাংলা বিভাগের কোর্স বণ্টন ও রুটিন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. ফজলে এলাহী চৌধুরী স্বাক্ষরিত ক্লাসরুটিনে দেখা যায়, ‘বাংলা কবিতা-৫’ (কোর্স কোড-৩২০৬) ক্লাসটি ড. মিল্টন বিশ্বাসের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
জানা যায়, অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস জুলাই হত্যাকাণ্ডে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুজন মোল্লা এবং বর্তমান আহবায়ক কমিটির সদস্য অনিক কুমার দাশের দায়েরকৃত মামলার অন্যতম আসামি। জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি রাজপথে থাকা শিক্ষার্থীদের জঙ্গি ও দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ সুজন মোল্লা বলেন, আমার হাজার হাজার ভাই জীবন দিয়েছে যে আন্দোলনে , সেই আন্দোলনের কালপ্রিটদের পুনর্বাসনের উৎসব চলছে। আমি চোখ হারিয়েছি, ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য অনিক গুলিবিদ্ধ। অথচ আন্দোলন চলাকালে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাথে ৩ জুলাই বৈঠক করা মিল্টন বিশ্বাস এখনো বহালতবিয়তে ক্লাস নিচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, নিশ্চয়ই প্রশাসনের অনুমতির বাইরে কিছু ঘটেনি। যদি এমন হয় প্রশাসন কোনোকিছুর বিনিময়ে তাদের পুনর্বাসন করতে চাইছে। তাহলে প্রশাসনকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
রুটিনে তার ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর জবি ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ফয়সাল মুরাদ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন,”ফ্যাসিবাদের দোসর ড. মিল্টন বিশ্বাস সাসপেন্ড থাকা অবস্থায় তাকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ার রুটিন প্রকাশ করা চরম নেক্কারজনক ও অগ্রহণযোগ্য।”
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন যদি অবিলম্বে এই অনিয়ম বন্ধ করে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে শিক্ষার্থীরা রাজপথে প্রতিবাদ করতে বাধ্য হবে। তখন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে এবং একে ‘মব’ আখ্যা দেওয়ার কোনো অধিকার প্রশাসনের থাকবে না।
কোর্স বণ্টন ও রুটিন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. ফজলে এলাহী চৌধুরী এই সিদ্ধান্তের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে একাডেমিক কমিটির ওপর ন্যস্ত করে দ্যা ঢাকা ডায়েরিকে জানান, “একাডেমিক কমিটির উপস্থিত সকল সদস্যের সম্মতিক্রমে তাকে ক্লাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একাডেমিক কমিটি খুব শক্তিশালী একটি জায়গা, তারা যা সিদ্ধান্ত নেয় তাই আসলে বাস্তবায়িত হয়”। তিনি নিজেকে কেবল একজন ‘কেরানি’ বা বাস্তবায়নকারী হিসেবে দাবি করে বলেন, কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তিনি রুটিনে মিল্টন বিশ্বাসের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
তবে এই বিষয়ে জানতে বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোজাহারুল আলম সেলিমের যোগাযোগ করা হলে তার শুরুতে তিনি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছিলেন যে, ড. মিল্টন বিশ্বাস কোনো ক্লাস নিচ্ছেন না। কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণের কথা বললে তিনি স্বীকার করেন যে, ড. মিল্টন বিশ্বাস নিজেই ক্লাস নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন এবং একাডেমিক কমিটির সভায় তাকে একটি অনলাইন ক্লাস নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত সাসপেনশন অর্ডার না আসায় তাকে রুটিন থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন।
এ বিষয়ে জানতে জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন এবং প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি।