বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন মহাস্থানগড়। আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস বহনকারী এই প্রত্নস্থল একসময় ছিল প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের প্রাণকেন্দ্র। তবে ইতিহাসের সেই গৌরব আজ নানা অব্যবস্থাপনা, অবহেলা এবং দখলের চাপে ক্রমেই ম্লান হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মহাস্থানগড়ের বিভিন্ন অংশে সংরক্ষণের অভাব স্পষ্ট। দুর্গনগরীর সীমানা ঘেরা প্রাচীন প্রাচীরের কিছু অংশ ভেঙে স্থানীয়দের চলাচলের জন্য পথ তৈরি করা হয়েছে। এসব পথে নিয়মিত মানুষ চলাচলের পাশাপাশি ভ্যান ও অটোরিকশাও যাতায়াত করছে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার জন্য এমন অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মহাস্থানগড়ের বিভিন্ন স্থানের বহু পুরনো ইট খুলে নিয়ে স্থানীয়ভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণেও ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব কর্মকাণ্ডের কারণে প্রাচীন স্থাপনাগুলোর মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, মহাস্থানগড় ছিল প্রাচীন বাংলার পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের রাজধানী পুণ্ড্রনগরের অংশ। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য শাসনামলে এ অঞ্চলের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে গুপ্ত, পাল ও সেন আমলেও এটি রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিসেবে পরিচিতি পায়।
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত এ প্রত্নস্থল একসময় শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রমেরও কেন্দ্র ছিল। বিশেষ করে বৌদ্ধ শিক্ষার প্রসারে এর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ইতিহাসবিদদের মতে, চীন ও তিব্বতসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভিক্ষু ও শিক্ষার্থীরা জ্ঞানচর্চার জন্য এখানে আসতেন।
আরও পড়ুন :দুই মাসের সংসার, তারপর মৃত্যু: বানারীপাড়ায় নববধূকে ঘিরে রহস্যের জট
মহাস্থানগড়ের ভেতর ও আশপাশে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক স্থাপনার চিহ্ন। খোদার পাথর ভিটা, বৈরাগীর ভিটা, গোকুলের মেড়, ভাসুবিহার, রাজা পরশুরামের বাড়িসহ নানা স্থানে বিভিন্ন সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাচীন মন্দির, স্তূপ, মুদ্রা ও পোড়ামাটির নিদর্শন পাওয়া গেছে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে বৈরাগীর ভিটা এবং লইয়েরকুড়ি এলাকায় খনন চালানো হয়। তখন মৌর্য, গুপ্ত ও পাল যুগের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং বৌদ্ধ স্তূপের সন্ধান মেলে।
তবে প্রত্নসম্পদের পাশাপাশি অব্যবস্থাপনার আলোচনাও নতুন নয়। সম্প্রতি প্রায় দুই দশক আগে বিদেশে প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে পাঠানোর সময় একটি মূল্যবান প্রত্নমূর্তি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জানা যায়, ঘটনার দীর্ঘ সময় পর সম্প্রতি এ বিষয়ে তদন্তে নয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে মহাস্থানগড়কে পর্যটনবান্ধব করতে অতীতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ঝুলন্ত সেতু, কাঠের ওভারব্রিজ, দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক একেএম সাইফুর রহমান বলেন, মহাস্থানগড়ের সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধা বাড়াতে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের পাশাপাশি এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতি পাবে বলে আশা করছেন তিনি।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন প্রকল্প আর পরিকল্পনার ঘোষণার বাইরে বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ প্রতিদিনের অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের বহু মূল্যবান চিহ্ন।