“শিকড়ে লেখা ইতিহাস, পাতায় জীবনের গান,
শতবর্ষী এই বৃক্ষ আমাদের গর্ব, আমাদের সম্মান।”
প্রকৃতি শুধু মানবজাতিকে অক্সিজেন ও ছায়াই দেয় না, বুকে ধারণ করে রাখে শতাব্দীর ইতিহাসও। আর সেই ইতিহাসেরই এক জীবন্ত মহাকাব্য হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এক ঐতিহ্যবাহী শিমুল-তুলা গাছ।
বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার সৈয়দকাঠী ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের ব্রাহ্মণবাড়ি এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘সরকার বাড়ি’র আঙিনায় অবস্থিত এই বিশাল বৃক্ষটি এখন ওই অঞ্চলের এক অনন্য গৌরব।
প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ঋতু পরিবর্তন, ঝড়-ঝঞ্ঝা, খরা আর প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে অটল দাঁড়িয়ে আছে এই গাছটি। এর বিশাল কাণ্ড, আকাশছোঁয়া উচ্চতা এবং চারদিকে বিস্তৃত ডালপালা যেন প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি, যা দূর থেকেই পথচারীদের মুগ্ধ করে।
প্রতি বছর বসন্তের আগমনীতে এই শিমুল-তুলা গাছটি এক অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়। পাতাঝরা ডালে ডালে ফোটে টকটকে লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন ফুল। ফুল ঝরে যাওয়ার পর যখন ফল পরিপক্ব হয়, তখন ভেতর থেকে বের হওয়া সাদা তুলা বাতাসে ভেসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামীণ প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে এবং আলোকচিত্র ধারণ করতে প্রতি বছরই দূর-দূরান্ত থেকে বহু প্রকৃতিপ্রেমী, ভ্রমণপিপাসু ও পর্যটকরা এখানে ছুটে আসেন।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, বহু বছর ধরে এই গাছের ছায়ায় গ্রামের মানুষ বিশ্রাম নিয়েছেন, আড্ডা দিয়েছেন এবং নানা সামাজিক মেলবন্ধনের সাক্ষী হয়েছে এই প্রাচীন বৃক্ষ। এটি কেবল একটি গাছ নয়, বরং ব্রাহ্মণবাড়ি এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।
তবে গাছটি দেখতে আসা পর্যটকদের জন্য অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই এলাকার অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। সরকার বাড়ির উত্তরসূরী উত্তম সরকার এই প্রতিবেদককে জানান:
”আমাদের এই গাছটির বয়স প্রায় ২০০ বছর। এটি দেখতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, এমনকি দেশের বাইরে থেকেও পর্যটকরা আসেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় দর্শনার্থীদের আসার পথে অনেক কষ্ট পোহাতে হয়। ঐতিহ্যবাহী এই গাছটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।”
একটি শতবর্ষী গাছ কেবল একটি বৃক্ষ নয়; এটি একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের স্মৃতির অমূল্য সম্পদ। এমন গাছ হারিয়ে গেলে গ্রামীণ ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় বিলীন হয়ে যাবে।
স্থানীয় সচেতন মহল, পরিবেশবাদী এবং এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে যেন—এই প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন শিমুল-তুলা গাছটিকে ‘সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একই সাথে এর প্রয়োজনীয় পরিচর্যা, নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন করা জরুরি।
সর্বোপরি, গাছ বাঁচলে বাঁচবে প্রাণ। প্রকৃতির এই অমূল্য দানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি দর্শনার্থী ও স্থানীয় প্রশাসনকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে।
One thought on "ইতিহাসের জীবন্ত মহাকাব্য: বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠীর প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন শিমুল-তুলা গাছ"
Comments are closed.