ইসলামের ইতিহাস মূলত ত্যাগ, ধৈর্য, ঈমান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মনিবেদনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যুগে যুগে মুমিনরা নিজেদের জীবন, সম্পদ, পরিবার, স্বপ্ন ও প্রিয় জিনিস আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে ইসলামের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিলের কোরবানির ঘটনা থেকে শুরু করে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ, ঈসমাইল (আ.)-এর পূর্ণ আনুগত্য এবং মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন সব ক্ষেত্রেই মুমিনের কোরবানির মহিমা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী ঈমান কেবল মুখের উচ্চারণ নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের ইচ্ছাকে সম্পূর্ণভাবে বিলীন করে দেওয়াই প্রকৃত কোরবানি।
তাই কোরবানি শুধুমাত্র পশু জবাইয়ের একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মুমিনের অন্তরের তাকওয়া, ভালোবাসা এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের বাস্তব প্রকাশ।
আরও পড়ুন :হজযাত্রায় পৌঁছেছেন ৭৯ হাজারের বেশি বাংলাদেশি, এখন পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যু
আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন মদিনাবাসী নির্দিষ্ট দুটি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এই দুটি দিন কিসের? সবাই বলল, জাহেলি যুগে আমরা এই দুই দিন খেলাধুলা করতাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দুই দিনের পরিবর্তে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিন।(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১১৩৪)
ইসলামের দৃষ্টিতে পার্থিব সম্পদ ও ভোগবিলাসের মোহ থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো পশু কোরবানি।
এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার ভোগ-প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, আল্লাহর জন্য আত্মনিবেদন এবং সৃষ্টির কল্যাণে আত্মনিয়োগের শিক্ষা লাভ করে। একই সঙ্গে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয় তার অন্তরে জাগ্রত হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)
পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ধর্মেই পশু কোরবানির রীতি বিদ্যমান। ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগেও পশু কোরবানির প্রচলন ছিল।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব ১০০ উট কোরবানি করেছিলেন।
কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল কোরবানির মাধ্যমে ঈমানি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেটিই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম কোরবানির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। কোরবানিকে মূলত ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিচিহ্ন বলা হয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে একাধিক পরীক্ষায় তাঁর সফল উত্তরণ এবং আল্লাহপ্রেমে তাঁর অসাধারণ আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতেই হজ ও কোরবানির বিধান দেওয়া হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে নিজেকে নির্বোধ করেছে, সে ছাড়া ইবরাহিমের ধর্মাদর্শ থেকে আর কে বিমুখ হবে! পৃথিবীতে তাকে আমি মনোনীত করেছি; আর আখিরাতেও সে অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণের অন্যতম। তার প্রতিপালক যখন তাকে বলেছিলেন, আত্মসমর্পণ করো, সে বলেছিল, জগত্গুলোর প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।’(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৩০-১৩১)
মুসলিম সমাজে ঈদ উদযাপনের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় নানা রূপে পরিচ্ছন্নতা অর্জন, উত্তম পোশাক পরিধান, পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানানো, তাকবির পাঠ, বৈধ বিনোদন, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, উত্তম খাদ্য গ্রহণ এবং অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো।
তবে বর্তমান সময়ে ঈদের পোশাক, খাদ্য ও আয়োজন নিয়ে যে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলাম সবসময় সামর্থ্য ও শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে জীবনযাপনের নির্দেশ দেয়।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘বাজারে বিক্রি হচ্ছিল এমন একটি রেশমি জুব্বা নিয়ে ওমর (রা.) আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি এটি ক্রয় করে নিন। ঈদের সময় এবং প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এটি দিয়ে নিজেকে সজ্জিত করবেন। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁকে বললেন, এটি তো তার পোশাক, যার পরকালে কল্যাণের কোনো অংশ নেই।’(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৪৮)
ঈদ উৎসবের ক্ষেত্রে ইসলামে খাদ্যের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নির্ধারণ করা হয়নি; বরং হালাল ও উত্তম খাদ্য গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আবহমান সংস্কৃতি ও সামর্থ্য অনুযায়ী মুসলমানরা তা গ্রহণ করতে পারে, তবে শর্ত হলো তা অবশ্যই হালাল ও স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আরাফার দিন, কোরবানির দিন ও আইয়ামে তাশরিক মুসলমানের ঈদের দিন। এগুলো খাওয়া ও পান করার দিন।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩০০৪)
কোরবানির ঈদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কোরবানি করা। আর্থিক সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কোরবানি ওয়াজিব। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ১০ বছর অবস্থান করেন। তিনি প্রতিবছর কোরবানি করেন।’(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৫০৭)
নবীজি (সা.) নিজের, পরিবারের এবং উম্মতের পক্ষ থেকে পশু কোরবানি করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি মোটাতাজা, শিংযুক্ত মেষ কোরবানি করতেন—একটি নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে এবং অন্যটি উম্মতের পক্ষ থেকে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২২)
তিনি কোরবানির গোশত নিজে গ্রহণ করতেন, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করতেন এবং উম্মতকেও একই নির্দেশ দিতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিবারকে কোরবানির এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন, প্রতিবেশীদের এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন আর ভিক্ষুকদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ সদকা করতেন।’ (আল-মুগনি : ৯/৪৪৯)
মূলত কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানরা একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়, যেমন তারা ঈদুল ফিতরে সদকাতুল ফিতরের মাধ্যমে সমাজের অসহায়দের ঈদের আনন্দে শামিল করে।
এক বছর মদিনায় অভাব দেখা দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দেন, কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ না করতে।(জাদুল মাআদ, পৃষ্ঠা-৪২৬)
তিনি ঈদের দিন কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং কোরবানির গোশত রান্না হলে প্রথম খাবার হিসেবে তা গ্রহণ করতেন। (সুনানে দারেমি, হাদিস : ১৫৬৭)
অতএব, প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তি, অহংকার, লোভ ও দুনিয়ার মোহকে কোরবানি করতে পারে। কারণ আল্লাহর পথে ত্যাগই মানুষকে তাঁর নৈকট্য, রহমত ও চিরস্থায়ী সফলতার দিকে নিয়ে যায়। তাই ইসলামের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।
2 thoughts on "ইসলামের ইতিহাসে মুমিনের কোরবানি: ত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার চিরন্তন শিক্ষা"
Comments are closed.