শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০২:১৩ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
বিশ্বকাপে আমন্ত্রণ পেয়েও যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারলেন না ফিলিস্তিন ফুটবল প্রধান ৩০ বছর জেল দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্টের ৪১ লাখ নারী পাবেন ফ্যামিলি কার্ড: প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন লালমনিরহাট সীমান্তে কড়া নজরদারি, বিজিবির সঙ্গে মাঠে স্থানীয়রাও চীনের মতো এগোতে হলে নিজেদেরই বদলাতে হবে: মির্জা ফখরুল অটো লগআউটের বিভ্রাটে ফেসবুক-মেসেঞ্জারের কোটি ব্যবহারকারী বাগাতিপাড়ায় জনকল্যাণে সহায়তার হাত প্রসারিত করলেন প্রতিমন্ত্রী পুতুল উপজেলা পর্যায়ে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প উদ্ভাবনী ধারণা,গবেষণা এবং স্টার্টআপ অনুষ্ঠিত। পঞ্চগড়ে এসএসসি পরীক্ষায় বিশেষ সুবিধা : কেন্দ্র সচিবের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ পঞ্চগড়ে ইউ-ড্রেন ভাঙায় ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী

চাকরির নামে কোটি টাকার বাণিজ্য, তিন দশকের সিন্ডিকেটের ভয়াবহ তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
  • ২০ মোট ভিউ

 

 

দেশের সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির নেটওয়ার্কের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক তদন্তে। প্রশ্নফাঁস, গোপন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেনের মাধ্যমে শত শত প্রার্থীকে মেধার প্রতিযোগিতা ছাড়াই চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ মিলেছে। পৃথক অনুসন্ধানে এসব তথ্য সামনে এনেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

 

২০২৪ সালের ৯ জুন রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের হওয়া পিএসসির প্রশ্নফাঁস মামলার তদন্ত শেষে গত ১৮ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে উঠে এসেছে, অন্তত তিন দশক ধরে বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল।

 

তিন দশকের প্রশ্নফাঁস চক্র

 

সিআইডির অভিযোগপত্র অনুযায়ী, চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবন এবং অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা।

 

তদন্তে বলা হয়েছে, বিসিএস, রেলওয়ে, বিআরটিএ, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন আগেভাগে সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের কাছে সরবরাহ করা হতো। পদভেদে একজন প্রার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হতো ৭ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত।

আরও পড়ুন :ঢাকার ৫৫ হটস্পটে ছিনতাই আতঙ্ক, পুলিশের নজরে ১,৩৮৭ দুর্ধর্ষ অপরাধী

প্রশ্নফাঁসের টাকায় সম্পদের পাহাড়

 

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসের অর্থে চক্রের সদস্যরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সৈয়দ আবেদ আলী ও তার প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটিরও বেশি টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। তার ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম ছাত্র থাকা অবস্থায় বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার এবং একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা গড়ে তোলেন।

 

অন্যদিকে গ্রেপ্তারের সময় পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলামের কাছ থেকে নগদ ৭১ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া পিএসসির উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১৩ কোটি টাকা এবং চক্রের আরেক সদস্য আবু সোলায়মান মো. সোহেলের বিভিন্ন হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা জমার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

 

গোপন ‘বুথে’ রাতভর প্রশ্ন মুখস্থ

 

তদন্তে সবচেয়ে আলোচিত যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো ‘বুথ’ নামে পরিচিত গোপন প্রস্তুতিকেন্দ্র।

 

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, বাসাবো ও এজিবি কলোনির বিভিন্ন বাসা ও আবাসনে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার এক বা দুই দিন আগে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের মোবাইল ফোন জমা রেখে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তর রাতভর মুখস্থ করানো হতো। পরীক্ষার দিন সকালে সরাসরি পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হতো।

 

তদন্তে দেখা গেছে, ৪৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগে এমন সুবিধা পাওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১৩ জন উত্তীর্ণ হন। একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও। সাভারের একটি রিসোর্টে প্রার্থীদের রেখে প্রশ্ন ও উত্তর পড়ানো হতো বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

প্রশ্ন পেয়ে পুলিশ ক্যাডারে যোগদানের অভিযোগ

 

তদন্ত প্রতিবেদনে আলোচিত একটি নাম ৩০তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডার কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমান। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সৈয়দ আবেদ আলীর মাধ্যমে প্রশ্ন সংগ্রহ করে তিনি পুলিশ ক্যাডারে চাকরি পান এবং পরবর্তীতে প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের সঙ্গেও যুক্ত হন।

 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জাকারিয়া রহমান বলেন, “প্রশ্নফাঁসের কোনো কিছুর সঙ্গে তার সামান্যতম সংশ্লিষ্টতা নেই।” এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তিনি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (মিডিয়া)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান।

 

পিএসসির ভেতর থেকেই প্রশ্ন সংগ্রহ

 

সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, প্রশ্নফাঁস চক্রের মূল উৎস ছিল পিএসসির অভ্যন্তর। জিজ্ঞাসাবাদে সাজেদুল ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন পিএসসির কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই সংগ্রহ করতেন।

 

এমনকি ২০২৪ সালে রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন পিএসসি সদস্যের কক্ষে রাখা ট্রাঙ্ক থেকে চুরি করে ফটোকপি করার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।

 

এবার নজরে মুক্তিযোদ্ধা কোটার ভুয়া সনদ

 

প্রশ্নফাঁস তদন্তের পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটার অপব্যবহারের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

 

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন বিসিএস ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের সনদ যাচাই করা হচ্ছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে ভুয়া বা জাল সনদ ব্যবহারের প্রাথমিক প্রমাণও মিলেছে।

 

ইতোমধ্যে ৩৮তম থেকে ৪৩তম বিসিএস পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি নবম বিসিএস থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোটার সুবিধা নিয়ে চাকরিতে প্রবেশকারীদের তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।

 

পানগাঁও কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার সাবরিনা আমিনের সম্পদ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তার মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এর সূত্র ধরে তার বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা যাচাই শুরু হয় এবং পরে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান চালানো হয়।

 

এছাড়া গত বছরের মে মাসে দুদকে জমা হওয়া এক অভিযোগে বলা হয়, জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে এলজিআরডি অডিট অধিদপ্তরে চাকরি নিয়েছেন গোপালগঞ্জের মাহমুদুল হাসান মামুন।

 

তবে এ অভিযোগ প্রসঙ্গে মাহমুদুল হাসান মামুন বলেন, “দুদক আমার ও আমার স্ত্রীর বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান করছে কি না তা জানা নেই। আর আমার বাবার নাম লাল মুক্তিবার্তায় রয়েছে। অতএব মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ভুয়া নয়।”

 

তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশ্নফাঁস এবং ভুয়া কোটার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে দেশের নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভাঙতে আরও বিস্তৃত তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে।

শেয়ার করুন

আরো সংবাদ ...
কপিরাইটঃ ২০২৬ দৈনিক সংবাদ শিরোনাম এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Developed by Infix Digital