সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর প্রচারণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার ঠেকাতে বিদ্যমান সাইবার সুরক্ষা আইনে ব্যাপক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন আইনে এসব অপরাধের সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণের পাশাপাশি কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হেলেন জেরিন খানের কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যে ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ ও প্রচার করা হচ্ছে, তা আদৌ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় পড়ে কিনা, সে বিষয়ে নতুন করে সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভার্চুয়াল মিডিয়া এবং অনলাইনভিত্তিক সব প্ল্যাটফর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘সাইবার স্পেস’-এর নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। সংশোধিত আইনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধান সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন :হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়াল ৮০ হাজার, মৃত্যু ৮ শিশুর
ডিজিটাল মাধ্যমে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপমানজনক, বিরক্তিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করার জন্য নতুন বিধান আনা হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে কোনো ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ পাঠানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগে বা আদৌ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তাই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কনটেন্ট অপসারণ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রিপোর্ট করা কনটেন্ট অপসারণ প্রক্রিয়াকে আরও জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সরকারের অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থা ও কর্তৃপক্ষকেও তথ্য-উপাত্ত অপসারণ, ব্লক বা হস্তান্তরের ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
হেলেন জেরিন খানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটাসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো অনেক অনুরোধে দ্রুত সাড়া দেয় না। এর অন্যতম কারণ বিদ্যমান আইনে পর্যাপ্ত বাধ্যবাধকতার অভাব।
মন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী কিছু দেশে আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে মেটাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশেও নতুন আইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করার বিধান রাখা হবে।
সাইবার অপরাধের পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধেও সরকার নতুন আইনি সংস্কার আনছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৮৬৭ সালের ঔপনিবেশিক যুগের জুয়া প্রতিরোধ আইন আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন আইনে অনলাইন ও অফলাইন জুয়া, বেটিং এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সংসদের চলতি অধিবেশনেই আইনটি উত্থাপনের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ ছাড়া মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আধুনিক পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষণ সুবিধা, ডগ স্কোয়াড এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোও নতুন আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামাজিক অনাচার, সাইবার অপরাধ, মাদক এবং অন্যান্য অপরাধ মোকাবিলায় সরকার একটি শক্তিশালী আইনগত কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছে। এসব আইন কার্যকর হলে জাতীয় প্রত্যাশা অনুযায়ী অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন আইন ও সংস্কারের মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দায়িত্বশীল, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।