নেপালের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। সাবেক র্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ যিনি বালেন নামে পরিচিত এবার প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হয়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। তরুণ ভোটারদের বড় অংশ তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা দেশটির পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া ঐতিহাসিক আন্দোলনে সহিংসতায় ৭৭ জন নিহত হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন। সেই সময় বালেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দেন, যেখানে তিনি তরুণ প্রজন্মকে দেশ গড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে আহ্বান জানান। তার ওই বার্তা দ্রুত ভাইরাল হয় এবং নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তরুণদের সঙ্গে সংযোগ
বালেনের জনপ্রিয়তার বড় কারণ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়নের বেশি। তিনি সরাসরি তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সংক্ষিপ্ত বার্তার মাধ্যমে রাজনৈতিক মতামত তুলে ধরেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের প্রচলিত রাজনৈতিক নেতাদের তুলনায় তিনি ভিন্ন ধারা প্রতিনিধিত্ব করেন। রাজধানীতে বাস ও যানবাহনে এমন স্টিকার দেখা যাচ্ছে যেখানে লেখা রয়েছে “বালেনের শহরের দিকে যাত্রা”, যা তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
মেয়র হিসেবে অভিজ্ঞতা
২০২২ সালে তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। মেয়র হিসেবে তিনি নগর অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। এসব উদ্যোগ অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
তবে তার বিরুদ্ধে সমালোচনাও রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, তিনি পুলিশ ব্যবহার করে রাস্তার হকার ও ভূমিহীন মানুষের সম্পত্তি জব্দ করেছেন। যদিও এসব অভিযোগ নিয়ে তিনি গণমাধ্যমে বিস্তারিত বক্তব্য দেননি।
সংগীত থেকে রাজনীতিতে উত্তরণ
বালেনের জন্ম এক পরিবারে যেখানে তার বাবা ছিলেন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক এবং মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই তিনি কবিতা ও সংগীতের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। পরে তিনি র্যাপ সংগীতে মনোযোগ দেন এবং আন্তর্জাতিক শিল্পীদের দ্বারা প্রভাবিত হন।
তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং পরে ভারতের দক্ষিণে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর করেন। সংগীতচর্চার পাশাপাশি তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ২০১৯ সালে প্রকাশিত তার জনপ্রিয় গান “বলিদান” ইউটিউবে কোটি কোটি দর্শক দেখেছেন। গানটির মাধ্যমে তিনি শাসনব্যবস্থার সমালোচনা ও সত্য প্রকাশের স্বাধীনতার কথা তুলে ধরেন। এই গান তাঁকে প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সম্প্রতি তিনি জাতীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে যোগ দিয়ে দলের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন। দলটি আগামী পাঁচ বছরে বারো লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জোরপূর্বক অভিবাসন কমানো এবং মাথাপিছু আয় তিন হাজার ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এছাড়া অর্থনীতির আকার একশ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং দেশের সব মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও তাদের ঘোষণাপত্রে রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি তিনি নির্বাচিত হন, তবে তার সাফল্য নির্ভর করবে একটি দক্ষ ও অভিজ্ঞ টিম গঠনের ওপর। কারণ নেপালের প্রশাসনিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও জটিলতায় ভুগছে। সঠিক সংস্কার ছাড়া পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।
সূত্র: সিবিসি