নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সেবা আরও সহজলভ্য করতে দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এ সেবার বিস্তার ঘটানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
বুধবার জাতীয় সংসদে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের জবাবে এ তথ্য জানান মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা, ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক পরামর্শ, আশ্রয় ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা নিয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
আলোচনায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএর ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’-এর তথ্য তুলে ধরে নিপুণ রায় বলেন, দেশে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৬২ শতাংশ ভুক্তভোগী কখনো তাদের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা কারও কাছে প্রকাশ করেননি।
তিনি বলেন, ‘একজন নারী যদি ঘরেও নিরাপদ না হন, একটি কন্যাশিশু যদি পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ না থাকে, তবে আমরা তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচার কোন সাহস দেব?’
জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার প্রথমে আটটি পুরনো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চালু হয়েছিল। পরে আরো ছয়টি নতুন মেডিকেল কলেজে চালু করা হয়। বর্তমানে ১৫টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার রয়েছে। এসব সেন্টারে চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, ডিএনএ ও ফরেনসিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনর্বাসনের সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি সেন্টারে ২২ জন করে জনবল থাকার কথা। এর মধ্যে চারজন চিকিৎসক, ছয়জন নার্স, চারজন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, একজন আইন কর্মকর্তা, একজন কম্পিউটার অপারেটর এবং আরো সহায়ক জনবল থাকার কথা।’
আরও পড়ুন:বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪০৪ মিলিয়ন ডলারের ঋণ-অনুদান চুক্তি
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এসব মেডিকেল কলেজে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে চাহিদা মেটানো ও সেবার পরিধি আরো বিস্তৃত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৯৫টি ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল’ কার্যক্রম চালু রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি জেলা সদর হাসপাতালে এবং ৬৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা দিচ্ছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৮১ হাজার ৯২৮ জন ভুক্তভোগী সহায়তা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৯ হাজার ৭৬৭ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৩১ হাজার ৫৯৬ জন এবং অগ্নিদগ্ধ ৫৬৫ জন রয়েছেন।
‘সরকারের লক্ষ্য হলো পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলা এবং দেশের প্রত্যেক উপজেলায় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল বা সেন্টার চালু করা’ বলেন তিনি।
সেবা কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে নতুন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আগে এই কার্যক্রম ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল নামে ছিল, পরে ‘মাল্টি-সেক্টরাল অ্যাপ্রোচ’ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। এখন নতুনভাবে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ বা কিউআরটি কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে, যাতে ঘটনা ঘটার পর দ্রুত ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো যায় এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা যায়।’
এ সময় জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সীমিত সচেতনতার বিষয়টি তুলে ধরেন নিপুণ রায়। তিনি বলেন, জরিপ অনুযায়ী মাত্র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ নারী ১০৯ হেল্পলাইনের বিষয়ে অবগত। অনেকেই জানেন না কোথায় এবং কীভাবে অভিযোগ জানাতে হয়।
এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, “নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধি। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বা গণআন্দোলন তৈরি করতে সরকার কাজ করছে।
‘শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সরকারি দল, বিরোধী দল, সংসদের বাইরের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষকসহ সবাইকে নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যন্ত কিশোর-কিশোরী ক্লাবের অংশগ্রহণে সচেতনতা কার্যক্রম নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯-এর জনবল সংকট ও বেতন জটিলতার বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কল সেন্টারের নম্বর হচ্ছে ১০৯। সেখানে সবাই কাজ করছে, কিন্তু তারা বছরের পর বছর বেতন পাচ্ছে না। এবার উদ্যোগ নিয়েছি, থোক বরাদ্দ দিয়ে তাদের বেতন চালু করার জন্য।’