টানা ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় চলমান বন্যা পরিস্থিতি জনজীবনের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙামাটি, কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট, ক্ষতিগ্রস্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলার লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক এলাকায় মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জনস্বাস্থ্য। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা পানি, দূষিত পানির ব্যবহার এবং নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিস-এসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের আশঙ্কাও তৈরি হয়।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বৈঠকের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) দেশের বন্যাকবলিত জেলা ও উপজেলাগুলোর জন্য বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে। নির্দেশনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেডিকেল টিম গঠন, ২৪ ঘণ্টা সমন্বয়ের জন্য ফোকাল পারসন নিয়োগ, জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখার কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে বন্যাকবলিত এলাকায় পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধ, ওরস্যালাইন (ওআরএস), শিরায় দেওয়ার স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং সাপের কামড়ের প্রতিষেধক (অ্যান্টিভেনম) মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার সময় পানি স্বচ্ছ দেখালেও তা জীবাণুমুক্ত নাও হতে পারে। তাই বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। পানি ঘোলা হলে প্রথমে পরিষ্কার সুতির কাপড় বা উপযুক্ত ফিল্টার দিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। এরপর পানি টগবগ করে ফুটতে (Rolling Boil) শুরু করার পর অন্তত ১ মিনিট ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করতে হবে। ফুটানোর সুযোগ না থাকলে নির্দেশনা অনুযায়ী ক্লোরিনভিত্তিক পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করা যেতে পারে। ফুটানো পানি সবসময় পরিষ্কার ও ঢাকনাযুক্ত পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া নলকূপের পানি জীবাণুমুক্ত না করে ব্যবহার করা উচিত নয়। নলকূপ নিরাপদ ঘোষণা করার পরই তা ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া, খোলা বা বাসি খাবার পরিহার করা এবং রান্নার কাজে নিরাপদ পানি ব্যবহার করা জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, ডায়রিয়া শুরু হলে দ্রুত ওরস্যালাইন পান করতে হবে এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ অব্যাহত রাখতে হবে। বারবার বমি, রক্তমিশ্রিত পায়খানা, উচ্চ জ্বর, তীব্র পানিশূন্যতা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বন্যা-পরবর্তী সময়ে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে পানিবাহিত রোগের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা, নিরাপদ পানি ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই বর্ষা ও বন্যা মৌসুমে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
ডায়রিয়া হলে দ্রুত ওরস্যালাইন পান করুন এবং গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে চিকিৎসা নিন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়েও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিশুদ্ধ পানি পান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অনেকাংশেই পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যা-পরবর্তী সময়েও সমন্বিত স্বাস্থ্য নজরদারি অব্যাহত রাখা গেলে সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য সংকট এড়ানো সহজ হবে।