জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহুল আলোচিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠেয় এ আয়োজনের স্বাগতিক দেশ হবে পাকিস্তান বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। একই সঙ্গে তিনি এই সমঝোতাকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সোমবার মধ্যরাতে চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার পর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে শেহবাজ শরিফ বলেন, দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মধ্যস্থতার ফল হিসেবেই এই সমঝোতা অর্জিত হয়েছে।
তিনি জানান, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের অবসান, ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের সময়জুড়ে পাকিস্তান শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে প্রথম দফা সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঐতিহাসিক সেই বৈঠক কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হলেও আলোচনা প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। পরে শেহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জানান, ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষ একটি ‘শান্তিচুক্তিতে’ পৌঁছেছে।
তিনি লিখেছিলেন, “লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে দুই পক্ষ।”
জাতীয় পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে শেহবাজ বলেন, আজ শান্তির ক্ষেত্রে একটি ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ অর্জন করেছে বিশ্ব। তিনি বলেন, “তিন মাস ১৬ দিনের নিরলস প্রচেষ্টার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সামরিক কর্মকাণ্ডের অবিলম্বে ও স্থায়ী সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েছে, যার মধ্যে লেবাননের সংঘাতও রয়েছে।”
জেনেভায় চুক্তি সই অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তান এই অনুষ্ঠানের আয়োজক হবে। এ জন্য তিনি পাকিস্তানের জনগণ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতীয় পরিষদের সদস্যদের অভিনন্দন জানান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিএমএল-এন প্রধান নওয়াজ শরিফের পরামর্শ সবসময় তার জন্য সহায়ক ছিল। তিনি প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও ধন্যবাদ জানান।
শেহবাজ বলেন, “এটি শুধু দুটি দেশের মধ্যে একটি চুক্তি নয়; এটি শান্তি ও সংলাপের বিজয়, একটি কূটনৈতিক সাফল্য।”
এসময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তার ভাষ্য, পুরো আলোচনা প্রক্রিয়ায় উভয় দেশের নেতৃত্ব কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। ফলস্বরূপ আজ বিশ্ব এই ঐতিহাসিক দিনের সাক্ষী হয়েছে।
শান্তি প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকার জন্য কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানিকে ধন্যবাদ জানান শেহবাজ। এছাড়া সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নেতৃত্ব ও সহযোগিতারও প্রশংসা করেন তিনি।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সহযোগিতার জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো এবং বিশ্বের অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম দেশের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ।”
শেহবাজ দাবি করেন, শান্তি প্রক্রিয়ায় ভূমিকার কারণে পাকিস্তান যে সম্মান অর্জন করেছে, তা পেতে অনেক দেশ দশকের পর দশক চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে একটি ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ অর্জিত হয়েছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য পাকিস্তানের নাম ইতিহাসে ‘স্বণাক্ষরে’ লেখা থাকবে।
সূত্র: দ্য ডন।